১.
সেদিন শিমুকে বলছিলাম... "তুমি জানো, তুমি যে একজন না মানুষ? কিন্তু যতটা না মানুষ তুমি নিজেকে দেখাও, ঠিক ততটাই হ্যাঁ মানুষ তুমি...."
শিমু ভ্রু কুঁচকে তাকালো, "না মানুষ... হ্যাঁ মানুষ!কী যা তা... বলেন তো?"
"অনেক কঠিন কঠিন মানুষের টার্ম ।কিন্তু টার্মগুলো বাস্তব। না মানুষ হলো ভয়ঙ্কর রকম মানুষ। ধরো, একটা মানুষ কাউকে খুন করে এসেছে। ডেডবডিকে পিস পিস করে কেটেছে কিছুক্ষণ আগে। এরপর বাসায় এসে চুপচাপ ভাত খেলো। সবার সাথে মজা করছে, হাসছে... একদম স্বাভাবিক। যেন কিচ্ছু হয়ই নাই! ভয়ানক রকম পিশাচ শ্রেণীর মানুষ ওরা।"
শিমু চোখ কপালে তুললো, "আমি নাকি না মানুষ! আমি পিশাচ শ্রেণীর! এটা কোন কথা?"
আমি ঠোঁট ওলটালাম, "কী জানি! তুমি নিজেকে দেখাও এরকম..."
"মানে, কে নিজেকে সেধে পড়ে এমন দেখাবে!!"
"তুমি দেখাও তো... আর আমি ঘুরে ফিরে এরকম একটা না মানুষের প্রেমে পড়লাম!"
"আমি নিজেকে পিশাচ দেখাই?"
"দেখাও তো.."
"কী যা তা... এসব কোন কথা?"
"হাসতে হাসতে খুন করতে পারো... এরকম পিশাচ।"
"আল্লাহ, আমি খুন করতে পারি!!"
"পারোই! তো... না মানুষ, ভালো আছেন?"
"না!"
"নাই কেন?"
"নাই আরকি!"
"না মানুষরা ভালো থাকে।কারণে অকারণে ভালো থাকে... ভালো নেই বললেও ভালো থাকে! ওরা পিশাচ শ্রেণীর হয়।"
"আচ্ছা।"
"শোনো একটু? তুমি তো আমাকে হাসতে হাসতে খুন করতে পারবা, আর কাউকে না পারলেও। আমাকে টুকরো টুকরো করে কেটে নদীতে ভাসিয়ে দিতে পারবে অনায়াসে।"
"আপনাকে কেন খুন করতে যাব আমি?"
"ব্যাপারটা হবে এরকম... তুমি ধরো আমাকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গেলে তোমাদের বাড়িতে।একবেলা ভরপেট খাওয়ালে... কাচ্চি, ইলিশ, গরু, রোস্ট... এসব। এরপর ধরো নিয়ে গেলে মেঘনার চরে। আমরা ঘুরছি। আমি হঠাৎ বললাম... ভালোবাসি।"
"তো?"
"তো... তুমি হেসে আমার দিকে তাকিয়ে দিলে হঠাৎ গলায় ছুরি চালিয়ে। শুনেছি গলা কেটে দিলে নাকি মানুষের শ্বাসনালী দিয়ে গরম বাতাস বের হয়। তুমি সেই গরম বাতাস অনুভব করবা। আমার রক্তে তোমার হাত মাখামাখি। তুমি আমার ডেডবডি পিস পিস করে কাটবে। কেটে টুক করে মেঘনায় ডুবিয়ে দিবে বস্তায় পুরে। এরপর মেঘনায় হাত মুখ ধুয়ে বাসায় এসে বাকি কাচ্চি, রোস্ট এসব খাবা... হাসবা। সব স্বাভাবিক যেন কিচ্ছুই হয় নাই।"
শিমু হাসছে। হাসলে মেয়েটাকে এত বেশি সুন্দর লাগে!
আমি বললাম, "এই যে দেখলে, তুমি হাসছো।তুমি এসব ভয়ঙ্কর খুনের কথা শুনে কীভাবে হাসছো! যতই বলি... ব্যাপারটা খুন করার কথাই বলা হয়েছে। তোমার সেটাতে প্রশান্তি আছে, লাল উষ্ণ রক্তের স্পর্শ আছে। কে জানে, সেদিন আমার কলিজা আর ফুসফুস এক টানে বের করে তুমি কচকচ করে খাবা কীনা! আমি শুনেছি না মানুষরা হৃদপিণ্ড খেতে পছন্দ করে। পিশাচ শ্রেণীর তো... সদ্য খুন করা মানুষের তাজা হৃদপিণ্ড কচকচ করে চিবিয়ে খায়... আর গালের দু'পাশ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ে।তুমিও আমারটা খাবা সেদিন!"
শিম হাসছে... খিলখিল করে হাসছে। মেয়েটার হাসি যতবার দেখি ততবারই মুগ্ধ হই। এত সুন্দর কারো হাসি হয়?
আমি একটু বিরতি নিয়ে আবার বললাম, "আচ্ছা আমার হৃদপিণ্ড কেমন? তেতো, টক, মিষ্টি নাকি পানসে? খাচ্ছো তো তুমিই... স্বাদ কেমন?"
শিমুর হাসি আরো চওড়া হলো, " খাই নাই তো এখনো। খাওয়ার পর নাহয় বলব!"
এবার শিমুর সাথে হাসিতে যোগ দিলাম আমিও।
২.
শিমুর বাড়িতে এসেছি দু'দিন হলো।
মেয়েটা খুব বেশি নাছোড়বান্দা, জেদি। তার জেদের কাছে আমি পরাজিত হই বারবার। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে হারতেও ভালো লাগে। আমি শিমুর জেদের কাছে বারবার নিয়ম করেই হেরে যাই। আমার ভালো লাগে।
সেদিন দুপুরে একদম কবজি ডুবিয়ে খেলাম বলতে গেলে। শিমু নিজের হাতে কাচ্চি বিরিয়ানি, শর্ষে ইলিশ, মুরগির রোস্ট রেঁধেছে। চাক চাক করে বেগুন ভাজিও করেছে মেয়েটা।
সন্ধ্যার দিকে মেয়েটা বললো, "মেঘনার চরে যাবেন?আজ কিন্তু পূর্ণিমা!"
আমি হাসলাম, "যাওয়া যায়... জিনিসটা খারাপ কী?"
মেঘনার চর। চারদিকে শুধু বালি আর বালি।চাঁদের রুপালি আলোয় সেই বালিকে কেমন সাদা সাদা দেখাচ্ছে। বালুকাবেলার একপাশে নদীর স্রোত আছড়ে পড়ছে... চাঁদের মরা আলোয় চিকচিক করছে রাতের মেঘনার কালো পানি।
আমি আর শিমু পাশাপাশি হাঁটছি। চাঁদের আলোয় মেয়েটাকে অসম্ভব রূপবতী দেখাচ্ছে।আমি মৃদুস্বরে ডাকলাম, "শিমু!"
"জ্বী?"
"একটা কথা বলি?"
"বলবেন?"
"হ্যাঁ... বলি?"
"ইচ্ছা..."
"আচ্ছা বলি!"
"আচ্ছা বলেন.."
"ভালোবাসি!"
শিমু হাসতে শুরু করলো, "আপনি জানেন এখন আমার কি করা উচিত?"
আমি একটু মৃদুস্বরে পালটা প্রশ্ন করলাম, "কী?"
"আমার কাজ এখন আপনাকে খুন করা...", শিমুর হাতে একটা মাঝারি আকারের ছুরির ফলা ঝিকিয়ে উঠলো।
" কী বলছো শিমু? আর হাতে ওটা কী!", আমি প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম।
"ছুরি... আজই কিনেছি নতুন। এক্সপোর্টেড জিনিস। খুব ধারালো। আপনি বুঝতেও পারবেন না।", শিমু অস্বাভাবিকরকম শান্ত কণ্ঠে বলে চলেছে... "খুব ভালোবাসেন আমাকে?"
"তো... বাসবো না?", আমার গলা অস্বাভাবিক রকম চড়া হয়ে গিয়েছে।
" উফ, চেঁচাবেন না তো! প্রকৃতির মৌনতা ক্ষুণ্ন হয়। এটা একদম উচিত না..."
শিমু হাসছে... খিলখিল করে হাসছে। জোছনার ম্লান আলোয় অপার্থিব লাগছে হাসিটা। এতটা সুন্দর কারো হাসি হয়? আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শিমুর হাসি দেখছি। ধারালো কিছু একটা আমার গলার চামড়া, চর্বি, শ্বাসনালী ভেদ করে একটু একটু করে ঢুকে যাচ্ছে। যন্ত্রনাটা কি আমি টের পাচ্ছি? ঠিক বুঝতে পারছি না।
আমি শিমুর হাসি দেখছি।পাগলের মতো হাসছে মেয়েটা। এত সুন্দরও কারো হাসি হয়?
পরিশিষ্ট :
বালির ওপর চিত হয়ে পড়ে থাকা মৃতদেহটার বুক চিরে হৃদপিণ্ডটা বের করলো মেয়েটা। তাজা হৃদপিণ্ডের একটা উষ্ণ গন্ধ মাথায় বাড়ি দিচ্ছে তার। ধীরে ধীরে হৃদপিন্ডটা মুখে পুরে চিবোতে শুরু করলো মেয়েটা। ঠোঁটের দু'পাশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। চাঁদের আলোয় রক্তের রঙ দেখাচ্ছে কালো।
মেঘনার জল, মেঘনার তট আর ওপরের আকাশ জোছনার আলোয় ভেসে যাচ্ছে। একটা অপার্থিব জোছনা। এরই মাঝে চিত হয়ে পড়ে থাকা মৃতদেহটার হৃদপিণ্ড চিবিয়ে খাচ্ছে মেয়েটা। রিশাদ কি জানবে, চাঁদের আলোয় ঠিক কতটা নিষ্পাপ, কতটা স্বর্গীয় লাগছে শিমুকে? রিশাদ কি জানবে, তার কচকচে হৃদপিণ্ডটার স্বাদ কেমন?
অকারণেই কান্না পেল শিমুর। মৃত রিশাদের খোলা চোখদুটো এখনো তার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ ভেউ ভেউ করে কাদঁতে শুরু করলো শিমু। অথচ না মানুষদের কাঁদতে নেই... একদম কাঁদতে নেই!
No comments:
Post a Comment